আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী এলাকাভিত্তিক জমিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত আয় তথা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকে বর্গমিটারের পরিবর্তে বর্গফুট হিসাবে কর দিতে হবে। অর্থ বিলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। গতকাল অর্থ উপদেষ্টা বাজেট ঘোষণা করেন।
তবে এ ধরনের বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনা কিংবা নির্মাণের জন্য বিনিয়োগ করা টাকা যদি এখন পর্যন্ত বলবৎ অন্য কোনো আইনের অধীন কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম থেকে উদ্ভূত হয় বা কোনো অবৈধ উৎস থেকে উদ্ভূত হয় তাহলে সে অর্থ এ সুবিধার আওতায় আসবে না। চলতি অর্থবছরে এসব অবৈধ আয় এ খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ ছিল না। তবে প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী আগামী অর্থবছর থেকে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে। এছাড়া অর্থের উৎস বৈধ না হলে আইনের এ ধারায় সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। এছাড়া একাধিক বিল্ডিংয়ের মালিক হলে ২০ শতাংশের বেশি কর দিয়ে প্রদর্শন করা যেত, এ সুযোগও বাতিল করা হয়েছে এবার। গোপন করা আয় ১৫০ শতাংশ কর দিয়ে প্রদর্শন করার সুযোগও বাতিল করা হয়েছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশে নির্মিত বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশের বেশি কর দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করা যেত, আগামী ১ জুলাই থেকে এটি ৫০ শতাংশ কর দিয়ে প্রদর্শন করা যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন) মঈদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সব ধরনের অপ্রদর্শিত পরিসম্পদ প্রদর্শনই বাতিল করা উচিত। নয়তো দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হয়। তবে এবার বলা হয়েছে, অবৈধ আয় এ বিশেষ বিধানে প্রদর্শন করা যাবে না। এবার প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন দুদক বিষয়টি দেখতে পারবে। এনবিআরেরও খতিয়ে দেখা উচিত আয়ের উৎস।’
অর্থ বিলে (২০২৫) বলা হয়েছে, ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত দুই হাজার বর্গফুটের অধিক প্লিন্থ আয়তনবিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট আয়তনের বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুটে ৯০০ টাকা এবং অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ২ হাজার টাকা কর দিতে হবে। এভাবে এলাকাভিত্তিক করহার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।
সে হিসাবে দুই হাজার বর্গফুট আয়তনের কোনো বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এ বিশেষ বিধানের সুযোগ নিতে হলে কর দিতে হবে ১৮ লাখ টাকা। দুই হাজার বর্গফুট আয়তনের কোনো বিল্ডিং, অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে কর দিতে হবে ৪০ লাখ টাকা।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (রিহ্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ব্রিক ওয়ার্কস লিমিটেডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শনের এ সুযোগকে আমরা স্বাগত জানাই। এছাড়া জমি নিবন্ধনের ফি কমানোর বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি। তবে জমি নিবন্ধনে বাজারমূল্য নয়, মৌজা মূল্য রাখা হোক।’
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই দেশের জাতীয় বাজেটে কালো টাকা সাদা করার বিধান রাখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২২ বার এ সুযোগ দেয়া হয়েছে। যদিও কালো টাকার পরিমাণের তুলনায় যৎসামান্য অংশই কর দিয়ে সাদা করা হয়।
এবারের বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখার নিন্দা জানিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, রাষ্ট্র সংস্কার, বিশেষ করে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যকে রীতিমতো উপেক্ষা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। একই সঙ্গে দুর্নীতিকে উৎসাহ দিয়ে রিয়েল এস্টেট লবির ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। করহার যা-ই হোক না কেন, এটি সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে যে অনুপার্জিত আয় অবৈধ হবে।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরো বলেন, ‘সবচেয়ে আশঙ্কা ও হতাশার ব্যাপার হলো সরকারের এ সিদ্ধান্ত দুর্নীতিকে উৎসাহ দেবে। এর মাধ্যমে সরকার বাস্তবে বছরজুড়ে অবৈধ ও অপ্রদর্শিত অর্থ-সম্পদ অর্জনের জন্য নাগরিকদের উৎসাহিত করছে এবং বছর শেষে কালো টাকাকে বৈধতা দেয়ার অঙ্গীকার করছে।’
সরকার কর্তৃক গঠিত দুদক সংস্কার কমিশনের অন্যতম সুপারিশ হচ্ছে কালো টাকাকে বৈধতা দেয়ার সব পথ চিরতরে রুদ্ধ করা, যার প্রতি এরই মধ্যে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এর বিপরীতে অবস্থান নিয়ে স্ববিরোধিতা করছে। সরকার নিজেকে বিব্রত করছে বলেও মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।